ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ , ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​ঢাকা ওয়াসায় নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য: অতিরিক্ত দায়িত্বে কোটি টাকার লেনদেন অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ০৯:৫২:১২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ০৯:৫২:১২ অপরাহ্ন
​ঢাকা ওয়াসায় নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য: অতিরিক্ত দায়িত্বে কোটি টাকার লেনদেন অভিযোগ

ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) নিয়োগ, বদলি ও পদায়নকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগ, অতিরিক্ত দায়িত্ব বণ্টনে অর্থ লেনদেন এবং প্রশাসনিক বিধি উপেক্ষার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে ২ হাজার ৫৯৪ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির চাকরিবিধি উপেক্ষা করে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে সংস্থাটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুস ছালাম ব্যাপারী এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের মুখে থাকা প্রকৌশলী মো. আব্দুস ছালাম ব্যাপারী সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। ইতোমধ্যে আদালত তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী বলেন, ওয়াসায় জনবল নিয়োগের আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার বিধান আছে কিনা তা এই মুহূর্তে তার মনে নেই। একইভাবে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়ার বিধান ওয়াসার প্রবিধানে রয়েছে কিনা তাও তার জানা নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে দায়িত্বে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চান না।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মনিরুজ্জামানও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

এদিকে সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলে জানানো হয়, তিনি মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ওয়াসাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৮ জানুয়ারি দুই বছরের জন্য একসঙ্গে ২ হাজার ৫৯৪ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৪ দিন আগে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সেবার প্রয়োজনীয়তাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক পত্রে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক উল্লেখ করেন, ওয়াসার বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের অনেককে বিলিং সহকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবহৃত পানির মাসিক বিল তৈরির কাজে যুক্ত। তবে মহানগরীর একাধিক বাড়ির মালিক অভিযোগ করেছেন, এসব কর্মচারীর কেউ কেউ বাসাবাড়ি বা নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে লাখ লাখ টাকা বখরা দাবি করেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মিটার ত্রুটিপূর্ণ, মিটার কারচুপি করা হয়েছে অথবা বিল কম উঠছে—এ ধরনের অভিযোগ তুলে হয়রানি করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে ওয়াসার স্থায়ী কর্মকর্তাদের কাছে গেলে তারা প্রায়ই বলেন, এসব কর্মচারী নিম্নশ্রেণির মাস্টাররোলভুক্ত এবং তাদের চাকরি স্থায়ী নয়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী কর্মকর্তারাই অফিসে বসে নির্দেশ দেন এবং মাঠপর্যায়ের এসব কর্মচারীদের দিয়ে নানা অনিয়ম করান।

ওয়াসাসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, শতাধিক কর্মকর্তাকে নিজ নিজ দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রেই ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০ জানুয়ারি রাজস্ব জোন-১ এর উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ সিদ্দিকিকে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তরে স্থানান্তর করা হয়। একই আদেশে উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে থাকা মো. রফিকুল ইসলামের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরেক আদেশে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা মো. ফখরুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের স্টাফ কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামানকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি সমন্বয় শাখার উপসচিব পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পৃথক আদেশে আটজন কর্মকর্তাকে উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হয়েছে। অন্য এক আদেশে উপপ্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সালেকুর রহমানকে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে পাঁচজন প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আরেক আদেশে ৩৮ জন পাম্প অপারেটরকে অফিস সহকারী ও তথ্য প্রবেশ অপারেটর পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুজন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে প্রশাসন-১ শাখায় এবং অপরজনকে ভূমি শাখায় পদায়ন করা হয়। পিএন্ডডি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন চৌধুরীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই মাসের ১০ ফেব্রুয়ারি চারজনকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর ৯ ফেব্রুয়ারি ছয়জন কর্মচারীকে মডস জোন-৩, ৪, ৫, ৬ ও ১০-এ অফিস সহকারী ও তথ্য প্রবেশ অপারেটর এবং পাম্পচালক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ, বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে ওয়াসার ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—বিধি উপেক্ষা করে এত বিপুলসংখ্যক নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের নেপথ্যে কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ